দীর্ঘ অর্ধশতক ধরে কাজলা সেতুর অপেক্ষায় ২০ গ্রামবাসী

রশি টেনেই নদী পার হাজারো মানুষের

এসকে সুজয়, নড়াইল

নড়াইল সদর উপজেলার কাজলা নদীর ওপর একটি সেতুর দাবিতে কেটে গেছে প্রায় অর্ধশতক। সময়ের সঙ্গে বদলেছে জনপদ, বেড়েছে জনসংখ্যা, উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে আশপাশের অনেক এলাকায়। কিন্তু কাজলা নদীর দুই পাড়ের মানুষের ভাগ্যে জোটেনি একটি সেতু। ফলে আজও নদীর দুই তীরে বাঁধা রশি টেনে একটি মাত্র খেয়া নৌকায় পারাপারই ভরসা হাজারো মানুষের।

মাত্র ৮০ মিটার প্রশস্ত একটি নদীর কারণে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে অন্তত ৫০ হাজার মানুষকে। পাঁচ কিলোমিটারের পথ যেতে অনেক সময় ১৫ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থী, রোগী, গর্ভবতী নারী, বৃদ্ধ ও কর্মজীবী মানুষ।

নড়াইল শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে মূলিয়া বাজার। বাজারের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে কাজলা নদী। নদীর দুই পাড়ে রয়েছে মূলিয়া, শেখহাটি ও তুলারামপুর ইউনিয়নের ১৫ থেকে ২০টি গ্রামের বসতি।

প্রতিদিন এসব গ্রামের মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে নড়াইল শহরে যাতায়াত করেন। কিন্তু নদীর ওপর একটি সেতু না থাকায় তাদের একমাত্র ভরসা একটি খেয়ানৌকা।

নদীর দুই পাড়ে বাঁধা রশি ধরে নৌকা টেনে পার হতে হয়। মাঝি থাকলে পারাপার কিছুটা সহজ হলেও অনেক সময় মাঝি না থাকায় যাত্রীদেরই নিজেরা রশি টেনে নৌকা চালিয়ে নদী পার হতে হয়। আবার মাঝি অন্য পাশে থাকলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বিশেষ করে রাতের দিকে এ দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে থেকে নৌকার অপেক্ষা করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অসুস্থ রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও সেতু না থাকায় মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। অনেক সময় রোগীকে স্ট্রেচার বা ভ্যানে করে ঘাটে এনে নৌকায় তুলতে হয়। বর্ষাকালে নদীর স্রোত বেড়ে গেলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। স্থানীয়দের দাবি, অতীতে নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে গর্ভবতী নারীসহ একাধিক রোগী চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন।

বাঁকড়ী গ্রামের বাসিন্দা দিবাকর পাঠক বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে কাজলা নদীর ওপর একটি সেতুর অভাবে আমরা চরম দুর্ভোগের মধ্যে আছি। কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। নদী পারাপারের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা না থাকায় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারেও নানা জটিলতা তৈরি হয়। একটি সেতু থাকলে রোগীকে দ্রুত ও নিরাপদে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হতো।”

তিনি আরও বলেন, “নিত্যদিনের হাট-বাজার, কর্মস্থল ও বিভিন্ন প্রয়োজনে চলাচলেও এলাকাবাসীকে ভোগান্তি পোহাতে হয়। সবসময় খেয়া নৌকা পাওয়া যায় না, অনেক সময় নিজেরাই রশি টেনে নৌকা পারাপার করতে হয়। তাই এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, কাজলা নদীর ওপর দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হোক, যাতে মানুষের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান হয়।”

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। মুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রান্ত ঘোষাল বলেন, “খেয়া নৌকায় নদী পারাপারের কারণে প্রতিদিন স্কুলে যেতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেক সময় নৌকা ঘাটে ভিড়লে দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়তে হয়, ফলে সময়মতো স্কুলে পৌঁছানো যায় না এবং শিক্ষকদের বকাঝকা শুনতে হয়।”

মুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিঠুন রায় বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী প্রতিদিন এই খেয়াঘাট দিয়ে যাতায়াত করে। নৌকার জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে গিয়ে তাদের মূল্যবান পড়াশোনার সময় নষ্ট হয়। অনেক সময় দেরি করে স্কুলে পৌঁছানোর কারণে ক্লাসও মিস করতে হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে নদীতে স্রোত বেড়ে গেলে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করে।

মুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সুন্দরী বালা বাগচী বলেন, “কাজলা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ আমাদের এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। আগে সেতু নির্মাণের জন্য মাটি পরীক্ষা হলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। সেতু না থাকায় শিক্ষার্থী, রোগীসহ সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

অর্ধশতকের বেশি সময় ধরে একটি সেতুর অপেক্ষায় দিন গুনছেন কাজলা নদীর দুই পাড়ের মানুষ। তাদের প্রত্যাশা, আর কোনো প্রতিশ্রুতি নয় দ্রুত সেতু নির্মাণের মাধ্যমে দুর্ভোগের স্থায়ী অবসান ঘটাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।”

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন